কোটি টাকার ব্যবসা

পদ্মা নদীতে জেলেরা সারা রাত মাছ ধরে। ভোরে সেই মাছ নিয়ে আসে মুন্সীগঞ্জের লৌহজং উপজেলার মাওয়া মত্স্য আড়তে।

ভোর ৫টা থেকে সকাল ৭টা পর্যন্ত এই আড়তে প্রায় কোটি টাকা লেনদেন হয়।

Loading...

 

 

মাওয়া মত্স্য সমবায় সমিতি সূত্র জানায়, ১৯৮৪ সালে মাওয়া চৌরাস্তা বরাবর পদ্মার পারে গড়ে ওঠে এ আড়ত। এর আগে প্রতিদিন জেলেরা পদ্মায় প্রচুর মাছ পেত। উপযুক্ত পথ ও উন্নত পরিবহন না থাকায় মাছ অন্য এলাকায় নিয়ে যাওয়া যেত না।

 

এলাকায় বরফকলও তেমন একটা ছিল না। তাই মাছ মজুদ করা যেত না। জেলেরা মাছ ধরে চৌরাস্তা বরাবর নদীর পারে নিয়ে আসত। এখানে মুন্সীগঞ্জ ও আশপাশের জেলার লোকজন ও ব্যবসায়ীরা আসত মাছ কিনতে। জেলেদের নৌকা থেকে মাছ কিনে নিয়ে তারা স্থানীয় বাজারগুলোতে বিক্রি করত।

 

ওই সময় পদ্মার মাছের খ্যাতি ছড়িছে পড়ে আশপাশের এলাকাগুলোতে। বিয়েশাদিসহ বড় বড় অনুষ্ঠানের জন্য মাছ কেনার জন্য লোকজন ছুটে আসত। কিন্তু একটা অনিশ্চয়তা তাদের মাঝে কাজ করত, নদীর পারে গেলে জেলে নৌকা পাবে কি না। আর পেলেও মাছ পাবে কি না। পেলেও চাহিদামতো পাওয়া যাবে কি না।

 

মাওয়া মত্স্য সমবায় সমিতির সাধারণ সম্পাদক মো. চান মিয়া মাদবর বলেন, ‘সেই সময় চিন্তাভাবনা করে কয়েকজন মিলে নদীর তীরের জমিতে গড়ে তুলি আড়ত। ছোট ছোট খুপরি ঘরের মতো করে জেলেদের মাছ বিক্রির ব্যবস্থা করি। সেই যে শুরু আজ এ আড়তের সুখ্যাতি ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন এলাকায়। ’ তিনি জানান, সম্পূর্ণ বেসরকারিভাবে ব্যক্তিগত জমিতে চলছে এ আড়ত।

 

পদ্মায় জেলেরা রাতভর মাছ ধরছে। ভোররাতে এসব মাছ নিয়ে আসছে এ আড়তে। ঢাকার বড় বড় বাজার ও আড়তের ব্যবসায়ীরা এখান থেকে মাছ কিনে নিয়ে যাচ্ছেন। এখানে মাছে ফরমালিন দেওয়া হয় না।

 

তবে সন্ধ্যায় যেসব জেলে মাছ নিয়ে আসে, তারা বরফ দিয়ে রাখে। স্থানীয়রা জানায়, বাড়িতে বিয়েশাদিসহ বড় কোনো অনুষ্ঠান থাকলে মাছের জন্য তারা চলে আসেন এ আড়তে।

 

মুন্সীগঞ্জ-বিক্রমপুরের একটা বড় অংশের মানুষ ঢাকায় বসবাস করে। তাদের ঢাকার বাসার জন্য এখান থেকে মাছ কিনে নিয়ে যান। আনুষ্ঠান হলেও তারা এখান থেকে রুই, পাঙ্গাশ কিনে নিয়ে যান। তবে পাইকারি ব্যবসায়ীরা ভোরে মাছ কিনতে আসার পথে নিরাপত্তার অভাব বোধ করেন।

 

এ বিষয়ে লৌহজং থানার ওসি মো. আনিচুর রহমান বলেন, ‘এ আড়তটি অনেক পুরনো। কখনো এখানে ছিনতাইয়ের মতো ঘটনা ঘটেনি। তবে বিষয়টি যখন জানলাম, এখন ব্যবস্থা নেব। ’

 

জাল ফেললেই বড় মাছ

মুন্সীগঞ্জের লৌহজং, টঙ্গিবাড়ী, শ্রীনগর ও তত্সংলগ্ন পদ্মায় মিলছে না ইলিশ। তবে বড় বড় মাছের আনাগোনা বেড়ে গেছে। ইলিশের জেলেদের দুর্দিন চললেও বড় বড় মাছ ধরা জেলেদের ঘরে চলছে আনন্দ। পদ্মায় জাল ফেললেই পাওয়া যাচ্ছে পাঙ্গাশ, বাঘাইড়, বোয়াল, রুই ও কাতলের মতো বড় বড় মাছ।

 

গত শনিবার ভোর ৬টায় সরেজমিনে মাওয়া বাজার বরাবর দক্ষিণের পদ্মার পারে মাওয়া মত্স্য আড়তে গিয়ে দেখা যায়, বড় বড় পাঙ্গাশ, বাঘাইড়ে ভরা বাজার। ইলিশের আড়তগুলোতে চলছে দুর্দিন। ইলিশ মাছ কম থাকায় দাম বেশ চড়া।

 

এসব দেখতে দেখতে শুরু হয়ে যায় হুড়াহুড়ি। লোকজন সরে যায় আড়তের রাস্তা থেকে। উঁকি দিয়ে দেখতে পেলাম, তিনজন একটি বিরাট আকারের বাঘাইড় নিয়ে প্রায় দৌড়াচ্ছেন।

 

পিছু পিছু ছুটছে কিছু লোক। খোঁজ নিয়ে জানতে পারলাম, শনিবার ভোররাতে মাছটি ধরা পড়েছে জেলে মজনু মিয়ার জালে। ওজন ৫৫ কেজি। অর্ধলাখ টাকায় মাছটি বিক্রি করেছেন ঢাকার কারওয়ান বাজারের এক ব্যবসায়ীর কাছে। বেজায় খুশি মজনু। তিনি বলেন, ‘দীর্ঘদিন ধরে পদ্মায় মাছ ধরছি। কিন্তু এত বড় মাছ এর আগে কখনো পাইনি। অনেকে মাছটি দেখতে ছুটে আসছেন। ’

 

পদ্মায় পাঙ্গাশ মাছের জাল ফেলা মত্স্যজীবী লৌহজংয়ের হলদিয়া গ্রামের আব্দুল আলী দেওয়ান জানান, এখন বড় বড় পাঙ্গাশ পাওয়া যাচ্ছে। সেই সঙ্গে পাওয়া যাচ্ছে বড় আকারের বাঘাইড়। বোয়াল, রুই কাতল, চিতলও মিলছে দেদার।

 

বহু বছর এমন মাছ পাওয়া যায়নি নদীতে। তিনি অভিযোগ করে বলেন, ‘রাতে নদীতে জলদস্যুদের কারণে মাছ ধরা কঠিন হয়ে পড়েছে। জাল ফেলার পর একশ্রেণির দস্যু সি-বোটে এসে অন্ধকারে তা কেটে নিয়ে যাচ্ছে।

 

এদের জন্য বেশ সজাগ থাকতে হচ্ছে। ’ তিনি আরো বলেন, ‘ভয়ভীতি যতই থাক যখন জাল তুলি, বড় বড় মাছের লাফালাফি দেখি, তখন মনটা ভরে যায়। কী রকম একটা সুখ পাই, তা বলে বেঝাতে পারব না। ’

 

এ বিষয়ে মুন্সীগঞ্জ জেলা মত্স্য কর্মকর্তা ড. আইয়ুব আলী বলেন, ‘গত ২২ দিন মা ইলিশ নিধন বন্ধে নদীতে আড়াআড়ি জাল পাতা বন্ধ ছিল। এর ফলে এমন বহু মাছ এখন দক্ষিণ থেকে নানা দিকে ছড়িয়ে পড়েছে। রংপুর হয়ে চিলমারী পর্যন্ত ইলিশ পৌঁছে গেছে। এর সঙ্গে অন্য মাছও ছড়িয়ে পড়েছে। এতে বংশবিস্তার বাড়বে।

 

এত দিন নদীতে আড়াআড়ি জাল পেতে রাখার কারণে মাছগুলো ভেতরের নদীগুলোতে তেমন প্রবেশ করতে পারত না। এবার এই জাল বন্ধ করা সম্ভব হয়েছে বলেই মাওয়ার কাছে এ রকম বড় বড় বাঘাইড় ও পাঙ্গাশসহ হরেক রকম মাছ ধরা পড়ছে। ’

Loading...