চীনের বন্দি শিবিরে নির্মম নির্যাতনের বর্ণনা দিলেন উইঘুর এই নারী

চীনের জিনজিয়াং প্রদেশে উইঘুর পরিবারে জন্ম মিহিরগুল তুরসুনের। প্রাথমিক পড়াশোনা শেষ করে মিসরের একটি বিশ্ববিদ্যালয়ে ইংরেজি পড়তে যান তিনি। সেখানেই প্রেম, বিয়ে। তিন সন্তানের জন্মও দেন তুরসুন।২০১৫ সালে নিজের পরিবারের সঙ্গে দেখা করতে চীনে ফিরে আসার সময় সঙ্গে ছিল তার তিন সন্তান। এর পরই বদলে যায় তার জীবন।

বাচ্চাদের থেকে আলাদা করে তাকে বন্দিশিবিরে নিয়ে যায় চীন সরকার। বিভিন্ন দফায় তিন বার তাকে আটক করা হয়।নারকীয় অত্যাচার চালানো হয় তার ওপর। মাকে না পেয়ে অযত্নে মারা যায় তার ছোট সন্তান। বাকি দুই সন্তান এখনো দুরারোগ্য অসুখের শিকার। সোমবার ওয়াশিংটনে চীনের উইঘুর মুসলিমদের ওপর চীন সরকারের বর্বরতার কাহিনী শোনাতে গিয়ে কান্নায় ভেঙে পড়লেন মিহিরগুল তুরসুন।

Loading...

উইঘুর মুসলিমদের ওপর চীন সরকারের অত্যাচারের অভিযোগ এই প্রথম নয়। চীনের বিভিন্ন বন্দিশিবিরে আনুমানিক ২০ লাখ উইঘুর মুসলিমকে বন্দি করে রাখা হয়েছে বলে অভিযোগ বিভিন্ন মানবাধিকার সংগঠনের।সোমবার যুক্তোষ্ট্রের ন্যাশনাল প্রেসক্লাবে পৃথিবীর ২৬টি দেশের দু’শ ৭০ জন গবেষক ও সমাজকর্মী উইঘুরদের ওপর অত্যাচার নিয়ে সারা পৃথিবীর দৃষ্টি আকর্ষণ করতে যৌথ বিবৃতি দেন। সেখানেই নিয়ে যাওয়া হয় মিহিরগুল তুরসুনকে।

মিহিরগুল বলেন, অত্যাচার সহ্য করতে না পেরে আমার মরে যেতে ইচ্ছে করছিল। আমি বারবার তাদের কাছে আমাকে মেরে ফেলতে অনুরোধ করেছি।একই সঙ্গে তিনি সামনে এনেছেন তার ওপর চলা ভয়াবহ অত্যাচারের বিবরণ। ২০১৫ সালে দেশে ফেরার পর তাকে তিন মাসের জন্য আটকে রাখা হয়েছিল বন্দিশিবিরে। ওই সময়ই মারা যায় তার কনিষ্ঠ সন্তান। শুধু তাই নয়, বাকি দুই সন্তানও অসুখে ভুগেছে।

দুই বছর পর তাকে আবারো আটক করা হয় বন্দিশিবিরে। কয়েকমাস বন্দি রেখে অত্যাচার চালানো হয়েছে তার ওপর। ছেড়ে দেওয়ায় সাত মাস পর আবার বন্দি করা হয় তাকে। এই দফায় তাকে বন্দিশিবিরে রাখা হয়েছিল তিন মাসের জন্য।তিনি আরো বলেন, বন্দিদশায় তাকে বিভিন্ন অজানা ওষুধ খেতে বাধ্য করা হত। এই ওষুধ খেয়ে অনেক সময়ই জ্ঞান হারিয়ে ফেলতেন তিনি। যে কক্ষে তাকে রাখা হয়েছিল, সেখানে তিন মাসের মধ্যে ৯ জন নারী মারা গেছেন বলে জানিয়েছেন তিনি।সেখানে ক্যামেরার সামনে তাকে মলমূত্র ত্যাগ করতে হত। চীনের কম্যুনিস্ট পার্টির স্তুতিতে গান করতে বাধ্য করা হত যখন তখন।

তার দাবি, একদিন আমাকে ন্যাড়া করে হেলমেটের মতো কিছু একটা পরিয়ে একটা চেয়ারে বসানো হয়। ইলেকট্রিক শক দেওয়ার সময় ভীষণভাবে কাঁপছিলাম। যন্ত্রণা ছড়িয়ে পড়ছিল আমার শিরা আর ধমনীতে। তার পর আর কিছু মনে নেই। আমি জ্ঞান হারিয়ে ফেলি। শুধু মনে আছে, আমি উইঘুর বলে ওরা আমাকে গালি দিচ্ছিল।এর পর সন্তানদের নিয়ে মিসর যাওয়ার অনুমতি পান মিহিরগুল। কায়রো পৌঁছেই মার্কিন দূতাবাসে যোগাযোগ করে নিজের ভয়াবহ অভিজ্ঞতার কথা জানান। তাকে আশ্রয় দেয় যুক্তরাষ্ট্র। এই মুহূর্তে তিনি বসবাস করছেন যুক্তরাষ্ট্রের ভার্জিনিয়ায়। ভুলে যেতে চান নিজের পিতৃভূমির ভয়াবহ স্মৃতি।এ ধরনের বন্দিশিবির থাকার কথা অস্বীকার করেছে চীন সরকার।

কিন্তু অপরাধীদের জন্য উইঘুর প্রদেশে বিভিন্ন প্রশিক্ষণ কর্মশালা থাকার কথা জানিয়েছে তারা। মানবাধিকার সংগঠনগুলোর অভিযোগ, এই প্রশিক্ষণ কর্মশালার আড়ালেই বন্দিশিবির চালাচ্ছে বেইজিং।পুরো চীন জুড়ে ‘এক শিক্ষা, এক সংস্কৃতি’ চালু করতে বেইজিং সরকারের পরীক্ষা নিরীক্ষার শিকার উইঘুর মুসলিমরা, এমনটাই অভিযোগ তাদের। এই অত্যাচারের হাত থেকে পালিয়ে বাঁচতে অনেকেই উইঘুর এলাকা ছেড়ে জীবন বিপন্ন করে পালাচ্ছেন এশিয়া, ইউরোপ ও যুক্তরাষ্ট্রে। শুধু উইঘুর নয়, চীন সরকারের সাংস্কৃতিক আগ্রাসনের শিকার এই অঞ্চলের কাজাখ মুসলিমসহ আরো বেশ কিছু প্রাচীন জনজাতি, এমনটাই জানাচ্ছে মানবাধিকার সংগঠনগুলো।

Loading...