বজ্রপাতের ভয় সাথে রেখেই ঝলমলে রোদে স্বপ্ন বুনছে হাওরাঞ্চলের কৃষক

বজ্রপাত, ঝড়-বৃষ্টির কারনে নীল আকাশে প্রায় এক মাস রৌদ না থাকায় ধান কাটা,মাড়াই ও শুকানোর কাজ করতে পারেনি কৃষক। কিংকর্তব্য বিমুখ হয়ে পড়েছিল হাওরাঞ্চলের লাখ লাখ কৃষক। প্রকৃতি এবার যেন মরার উপর খারার ঘাঁ হয়ে সামনে এসে দাড়িয়েছি হাওরবাসী সামনে।

গত দুদিন ধরে নীল আকাশে সোনালী রৌদ্রের ঝিলিক দেখা দেওয়ায় খলায় খলায় বৈশাখী উৎসব নয় এ যেন চলছে নবজাতক জন্ম (কষ্টের ফলানো বোরো ধান শুকানো) নেওয়ার আনন্দ এখন হাওরে হাওরে।

জানা যায়,বৈশাখ মাসের যে পিটপুড়া রৌদ্র হাওরপাড়ে থাকার কথা এবার ছিল না। মার্চ মাসের শুরুতেই ছিল ঝড়,বৃষ্টি এরমধ্যে আবার ছিল ধান কাটার শ্রমিক সংকট। এরই মধ্যে যে সমস্ত হাওরে ধান কাটা হয়েছিল তাও বৃষ্টির কারণে জমি থেকে পরিবহন করা ছিল অযোগ্য।

তারপরও অনেক কষ্ট স্বীকার করে জমি থেকে কাটা ধান খলায় নিয়ে আসা হয়। সেই ধান মারাই করা হয় কিন্তু সে গুলোকে রৌদে শুকাতে না পারায় চারা গজিয়েছিল। প্রকৃতির এই বিরুপ নির্মমতায় সব মিলিয়ে কৃষকরা নিঃশ্বাস ত্যাগ করতে পারছিল না। আর পাকা ধান নিয়ে দিশেহারা হয়ে পড়েছিল কৃষক।

একেতো পরপর গত দুই বছর হাওরের ফসল ডুবায় প্রায় নিঃস্ব হয়ে পড়েছে কৃষক পরিবার। এবার কিছুটা আনন্দে ছিল কৃষকগন ভাল ফসল হওয়ায়। কিন্তু প্রকৃতি যেন নির্দয় আচরন শুরু করে অসহায় কৃষকদের সাথে।

বৈশাখ মাস শেষ এখন গত দু-দিন প্রখর রৌদ্র ওঠার ফলে উৎসব হিসাবে ধান শুকানোর কাজে এখন ব্যস্ত সময় পার করছে হাওরপাড়ের লাখ লাখ কৃষকগন। হাওরাঞ্চলের প্রতিটি খলায় এখন পুরুদমে চলছে কাক ফাটা রৌধে কষ্টের ফলানো বোরো ধান শুকানোর কাজ। এই কাজে এখন যুক্ত হয়েছে স্কুল,কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়–য়া ছেলে,মেয়ে সহ পরিবারের সকল সদস্যগন।

হাফিজ উদ্দিন, খেলু মিয়া, বাচ্চু মিয়াসহ জেলার হাওর পাড়ের কৃষকগন বলেন, হাওর থেকে ধান কেটে আনতে পারলেও বৈরী আবহাওয়ার কারনে ধানই মারাই করে খলায় বসেছিলাম রৌধ না থাকায়। রুদ্র ওঠায় হাওরের সকল কৃষকের মূখে হাসি ফুটছে এ যেন রুদ্র নয়,এটি আল্লাহর নিয়ামত। সবাই ভিন্ন আমেজে ধান শুকাছি খলায় আর আনন্দ করছি। রুদ্রে উঠেছে এবার ধানই গুলাতে রৌধে শুকিয়ে গোলায় তুলতে পারব।

তাহিরপুরের কৃষক নাজমুল হুদা সংগ্রাম,সাদেক আলী,আব্দুল আহাদ বলেন,ছোট বয়সে বৈশাখ মাস এলে ধানের খলায় কলস ভর্তি পানি নিয়ে যেতাম বেপারীদের জন্য। এইবার কি বৈশাখ আইলো খলাতে কলস ভর্তি পানি নিয়ে যাবো দূরের কথা গ্লাস দিয়ে পানি নেয়ার প্রয়াজন হয় নাই।

গত দু বছর পানিতে খাইছে ধান। এবার ঝড়, বৃষ্টিতে নাজেহাল। প্রায় এক মাস পর রৌদ উঠায় সবাই এখন ধান শুকাতে ব্যস্থ। পাশাপাশি এবার গো খাদ্য খড় যোগার করা সহজ হবে।

সুনামগঞ্জ কৃষি সম্প্রসারন কার্য্যালয় সূত্রে জানা যায়, জেলার আবাদ জমির পরিমান ২লাখ ৭৬হাজার ৪শত ৪৭হেক্টর। এবার ২লাখ, ২১হাজার ৭৫০হেক্টর জমিতে চাষাবাদ হয়েছে। আর বোরো ধানের লক্ষ্যমাত্র ১২লাখ ১৯হাজার ৪১৪মেট্রিকটন ধান।

যার মূল্য ২হাজার ৯২৪কোটি ৬৭লাখ ৩৬হাজার টাকা। কিন্তু সুস্বাদু ও স্থানীয় জাতের ধানের পরিমান একবারেই সামান্য। এবার জেলার ছোট বড় ৫২টি হাওরের বোরো ফসলরক্ষা বাঁধ নির্মান করে প্রকল্প বাস্থবায়ন কমিটিকে(পিআইসি)।

৯৬৬টি পিআইসি কে ১৭৭কোটি টাকা বরাদ্ধ দেওয়া হয়। এই বরাদ্ধের মধ্যে ১৩৩কোটি টাকা ছাড় দেওয়া হয়েছে। সর্ব মহলের দাবী যে বাঁধে সঠিক ভাবে কাজ হয়েছে তাদেরকেই যেন বরাদ্ধের টাকা দেওয়া হয়। কারন অনেকেই এবারও বাধেঁ দূর্নীতি করেছে।

তাহিরপুর উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা মুহাম্মদ আব্দুছ ছালাম বলেন,বৈশাখ মাস প্রায় পুরোটাই বৈরী আবহাওয়ায় হাওরের কৃষক অনেকটাই ঝিমিয়ে পরেছিল। এখন থেকে টানা সাপ্তাহ রুদ্র থাকলে কৃষকের ধান নিশ্চিন্তে গুলায় তুলতে পারবে।

তাহিরপুর উপজেলা নির্বাহী অফিসার পূর্ণেন্দু দেব বলেন,দীর্ঘদিন পর প্রখর রুদ্র ওঠায় উপজেলা বিভিন্ন হাওরের কৃষকরা মনের আনন্দে ধান শুকানোয় ব্যস্ত সময় পার করছে। প্রকৃতপক্ষে আজকের রুদ্র এক সপ্তাহের কাটামারা এগিয়েছে। আমি নিজেও কৃষকদের আনন্দ দেয়ার জন্য বিভিন্ন ধানের খলাতে ঘুরে দেখেছি।

তাহিরপুর উপজেলা পরিষদ চেয়ারম্যান কমারুজ্জামান কামরুল বলেন,এখন মেঘ নেই আকাশে তাই সূর্যের প্রখর রৌধ দেখে কৃষকের মূখে হাসি দেখা দিয়েছে। কষ্টের ফলানো বোরো ধান রৌদে শুকাতে পারবে তুলতে পারবে গোলায় সেই আশায়। আবহাওয়া এমন থাকলে কৃষকের শত কষ্টের মাঝে এবার আনন্দের শেষ থাকবে না।

সুনামগঞ্জ জেলা কৃষি সম্প্রসারন অধিদপ্তরের উপ-পরিচালক স্বপন কুমার সাহা জানান, কৃষকগন এবার হাওরে পাকা বোরো ধান নিয়ে টানা বৃষ্টিপাতের কারনে খুবেই কষ্টের মধ্যেই ছিল। জমি থেকে ধান কেটে খলায় এনে রেখেছে কিন্তু রৌধ না থাকায় শুকাতে পারে নি।

হাওরে প্রায় ৯০ভাগ বোরো ধান কাট হয়েছে। এখন প্রখর রৌদ উঠার হাওরে ধান শুকানোতে ব্যস্থ কৃষকগন। এমন রৌদ থাকলে কয়েক দিনের মধ্যে সব ধান কাটা, মাড়াই ও শুকানোর কাজ শেষ হবে।