নতুন প্রধানমন্ত্রী মাহাথিরের কন্ঠে এখন উল্টো সুর

ভোটে জিতেই নিজের অবস্থান থেকে সরে এলেন মালয়েশিয়ার নতুন প্রধানমন্ত্রী মাহাথির মোহাম্মদ। তিনি বলছেন, গণমাধ্যমের স্বাধীনতা ও বাক্‌স্বাধীনতার একটা ‘সীমা’ থাকা উচিত।

নির্বাচনী প্রচারের সময়ে মাহাথির ওয়াদা করেছিলেন, ক্ষমতায় এলে তিনি আগের সরকারের করা বিতর্কিত ভুয়া খবরবিরোধী আইনটি বাতিল করবেন। আর এখন এ আইনের নতুন সংজ্ঞা দেওয়ার কথা বলছেন। খবর বিবিসির।

Loading...

গত সপ্তাহের নির্বাচনের ঠিক আগে প্রবর্তিত এ আইন বাক্‌স্বাধীনতা খর্বকারী বলে সমালোচিত হয়।

সে সময় মাহাথিরও আইনটির লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত হয়েছিলেন।

মালয়েশিয়ার নির্বাচনে বিরোধীদের জয়: পেছনের ও সামনের কিছু গল্প

মালয়েশিয়ার নির্বাচনে বিরোধীদের জয়: পেছনের ও সামনের কিছু গল্প।

প্রথমেই নির্বাচনের বিস্তারিত ফলাফলটা একনজরে দেখে নিতে চাই:

পার্লামেন্টে মোট আসন- ২২২ টির মধ্যে দলগুলোর প্রাপ্ত আসন;
* সরকারী জোট/দল, বিএন (বারিসান ন্যাশনাল): ৭৯ টি আসন।

* বিরোধী জোট, পিএন (পাকাতান হারাপান) ১১৩ টি আসন।
* মূলধারার ইসলামপন্থী দল, পাস:১৮ টি আসন (তারা ১৫৭ টি আসনে নির্বাচন করেছিল)

বিরোধী জোটে গুরুত্বপূর্ণ দল:
* আনোয়ার ইব্রাহিমের দল (পিকেআর): ৪৯ টি আসন (তারা ৭২ টিতে নির্বাচন করেছিল)
* চাইনিজদের দল (ডিএপি): ৪২ টি আসন (৪৭ টিতে নির্বাচন করেছিল)

* মাহাথির মোহাম্মদের নবগঠিত দল (পিপিবিএম): ১২ টি (৫২ টি আসনে নির্বাচন করেছিল)
* পাস থেকে বের হয়ে যাওয়া ইসলামপন্থী দল, আমানাহ: ১০ টি (৩৩ টি আসনে নির্বাচন করেছিল)

শুধু মালয়েশিয়ার নয় বরং পুরো বিশ্বে বিশেষ করে মুসলিম দেশগুলোতে মাহাথির মোহাম্মদ ও আনোয়ার ইব্রাহিম পরিচিত ও জনপ্রিয় দুটি নাম। মাহাথির মোহাম্মদ আজকের আধুনিক মালয়েশিয়া গড়ার কারিগড়, আর আনোয়ার ইব্রাহিম উনার একসময়কার সহযোগী ও একবিংশ শতাব্দীতে মালয়েশিয়ার সবচেয়ে মাজলুম নেতাদের একজন।

১৯৮১ সাল থেকে ২০০৩ সাল পর্যন্ত বারিসান ন্যাশনাল (বিএন) দলের হয়ে প্রধানমন্ত্রী ছিলেন মাহাথির। উনি যখন প্রধানমন্ত্রী হন তখন আনোয়ার ইব্রাহীম ইসলামপন্থী দল পাসের ঐ সময়কার সহযোগী যুব সংগঠন আবিম (ABIM) এর চেয়ারম্যান ছিলেন।

আনোয়ার ইব্রাহিম ক্যারেসমেটিক যুব নেতা হওয়ার কারনে মাহাথির তার দলে তাকে যোগ দেওয়ার অনুরোধ করেন। অনেক চিন্তা ভাবনা ও ঘটনার পর আনোয়ার মাহাথিরের দলে যোগ দেন এবং ১৯৯৩ সালে ডিপুটি প্রধানমন্ত্রী পদে নিয়োগ পান। ১৯৯৩ সাল থেকে ১৯৯৮ সাল পর্যন্ত সময়ে মাহাথির মোহাম্মদের ছায়াসঙ্গী হিসেবে মালয়েশিয়ার উন্নয়নে ব্যপক ভূমিকা পালন করেন এবং বিপুল জনপ্রিয়তা অর্জন করেন।

উনার এই জনপ্রিয়তা সম্ভবত মাহাথিরকে ইর্শান্বিত করে তোলে অথবা দলে মাহাথির পরবর্তী নেতা নির্বাচনের প্রশ্নে মাহাথিরকে ভুল বুঝিয়ে দুনেতার মধ্যে সম্পর্কের ফাটল ধরানো হয়। যার ফলে আনোয়ার ইব্রাহিমকে পদত্যাগে বাধ্য করা হয় এবং একসময় দুর্নীতির মামলায় কারাগারে পাঠানো হয়।

২০০৪ সালে প্রায় পাঁচ বছর কারাভোগ করার পর মুক্তি লাভ করে বিরোধী দলগুলো নিয়ে জোট করে ২০০৮ সালের নির্বাচনে রীতিমত হইচই ফেলে দেন। যার ধারাবাহিকতায় ২০১৩ সালের নির্বাচনেও ভালো ফলাফল করেন। ২০০৮ সাল থেকে ২০১৫ সাল পর্যন্ত তিনি বিরোধীদলীয় নেতা ছিলেন।

কিন্তু ২০০৮ সালে এসে নতুন ষড়যন্ত্রের স্বীকার হন তিনি। কথিত সমকামীতার মিথ্যা অভিযোগে তিনি অভিযুক্ত হন এবং পরবর্তীতে তাকে কারাগারে প্রেরণ করে। এ বছরের জুন মাসে তার কারাবাস শেষ হওয়ার কথা।

এবার একটু ফিরে যাই বর্তমান প্রধানমন্ত্রী নাজিব রাজ্জাকের দিকে। তিনি একসময় মাহাথিরের মন্ত্রীসভার সদস্য এবং পরবর্তীতে মাহাথিরের সমর্থনেই প্রধানমন্ত্রী হন। কিন্তু কয়েকবছর ধরে বেশ কিছু দুর্নীতি ও অসৎ পন্থার অভিযোগ উঠে তার বিরুদ্ধে।

এদিকে মালয়েশিয়ার আর্থ-সামাজিক অবস্থাও দিন দিন নিন্মমুখি হচ্ছে। সবমিলে বিরোধী জোট তীব্র প্রতিবাদ গড়ে তোলে। অবস্থার এতটাই খারাপ দিকে চলে যায় যে, ৯০ বছর বয়সী মাহাথিরও নাজিবের বিরুদ্ধে মাঠে নামেন এবং ২০১৬ সালে নতুন দল গঠন করেন। পরবর্তীতে আনোয়ার ইব্রাহীমের বিরুদ্ধে করা জুলুমের জন্য ক্ষমা চেয়ে বিরোধী জোটে এসে শামিল হন এবং এ বছরের শুরুতে বিরোধী জোট তাকে প্রধানমন্ত্রী প্রার্থী হিসেবে ঘোষণা করে।

এবার ফিরে যাই ইসলামপন্থী দলগূলোর দিকে। মূলধারার ইসলামী দল হিসেবে পাস দীর্ঘদিন ধরে মালয়েশিয়ার রাজনীতিতে মোটামুটি ভালো অবস্থানে আছে। জাতীয় সংসদে ২০০৮ সালে আনোয়ার ইব্রাহীমের দলের সাথে জোট করে ২৩ টি ও ২০১৩ সালে ২১ টি আসন লাভ করে। পাশাপাশি মালয়েশিয়ার ১২ টি রাজ্য সরকারের মধ্যে কেলাতান ও তেরেঙ্গানু নামক দুটি রাজ্যে তারা কয়েকবার সরকার গঠন করেছে। বিশেষ করে নব্বয়ের দশক থেকে টানা কেলাতান রাজ্যে জয় পেয়ে আসছে।

কিন্তু কয়েকবছর আগে পাস নাজিব রাজ্জাকের প্ররোচনায় আনোয়ার ইব্রাহিমের জোট থেকে বেরিয়ে আসে এবং নাজিবকে সমর্থন দিতে থাকে। মাঝে নাজিবের সাথে জোটের ব্যপারে কথাও হচ্ছিল। এ ঘটনায় পাস থেকে একটি গ্রুপ বেরিয়ে যায় এবং আমানাহ নামক নতুন দল গঠন করে। আমানাহ আনোয়ার ইব্রাহিমের সাথে জোটে কনটিনিউ করে।

ছোটখাট এতটুকু ইতিহাস নিয়ে গল্পের পর এবার যাই কিছু পর্যালোচনায়:

১. মাহাথির মুহাম্মদের ৯০ বছরে রিটায়ার্ড লাইফ থেকে ফিরে এসে সরকারের বিরুদ্ধে বিরোধীদের সাথে যোগ দেওয়াটা একটা বড় ঘটনা, স্বভাবতই ফলাফলে এর একটি প্রভাব রয়েছে।

২. যদিও মাহাথির মুহাম্মদের প্রভাবটা একদম কম নয় তবুও আমার মতে এই বিজয়ের মূল কারিগড় কিন্তু আনোয়ার ইব্রাহিমই। কারন:
প্রথমত: গত নির্বাচনেই তার জোটের ভোট ৫০% এর উপরে চলে গিয়েছিল কিন্তু আসন সংখ্যার দিক থেকে নাজিব রাজ্জাক বেশী পাওয়ার কারনে স্বভাবতই আনোয়ার ইব্রাহিমরা সরকার গঠন করতে পারেনি। নাজিব রাজ্জাকরা সরকার গঠনের পর থেকে সীমাহীন দুর্নীতি ও অর্থনৈতিক মন্দাতে আনোয়ার ইব্রাহিমের পাল্লা এমনিতেই ভারী ছিল।

দ্বিতীয়ত: মাহাথিরের কারনেই আনোয়ার ইব্রাহীমের দীর্ঘদিন কারাবরণ ও অনিশ্চিত গন্তব্যের জীবন পরিচালনা করতে হয়েছে। তারপরও জাতীয় স্বার্থে তিনি যেভাবে মাহাথিরকে ক্ষমা করে দিয়ে প্রধানমন্ত্রী প্রার্থী হিসেবে মেনে নিয়েছেন তাতে জনগনের ভালোবাসা ও সমর্থন আরো বেড়েছে।

তৃতীয়ত: এবারের নির্বাচনের ফলাফলে আনোয়ার ইব্রাহীমের দল যেখানে ৭২ টিতে ইলেকশন করে ৪৯ টিতে জয় পেয়েছে সেখানে মাহাথিরের দল ৫২ টিতে ইলেকশন করে ১২ টিতে জয় পেয়েছে। উল্লেখ্য, আনোয়ার ইব্রাহিমের দল ২০১৩ সালে ২৮ আসনে জয় পেয়েছিল। সে হিসেবে এবার ২১ টি আসন তার দলের বেড়েছে।

৩. ইসলামপন্থী দল পাস রাজ্য সরকার পরিচালনায় সফল হয়েছে এবং জনগন তাদের মনে প্রাণে গ্রহন করেছে। তাই রাজ্যে তাদের প্রভাব কমেনী বরং নতুন করে কয়েকবছর পর তেরেঙ্গানুতে আবার জয় পেয়েছে।

কিন্তু জাতীয়ভাবে নাজিব রাজ্জাককে সমর্থন দেওয়াটা জনগন সম্ববত ভালোভাবে নেয়নি, তাই জাতীয়ভাবে তাদের আসন সংখ্যা কমেছে। এক্ষেত্রে জাতীয়ভাবে ভালো করেছে আমানাহ নামক দলটি। নতুন হওয়া একটি দলের ৩৩ টি আসনে ইলেকশন করে ১০ টিতে জেতাকে বড় জয়ই মনে হয়।

৪. সরকারে মাহাথির প্রধানমন্ত্রী হলেও মূল প্রভাব থাকবে আনোয়ার ইব্রাহিমের দলেরই। কেননা সংসদে মাহাথিরের আসন সংখ্যা মাত্র ১২ টি। আর তাই আনোয়ার ইব্রাহীম কারাবাস থেকে মুক্তির পর প্রধামমন্ত্রী হয়ে দেশকে এগিয়ে নিয়ে যেতে পারলে মালয়েশিয়ায় নতুন এক যুগের সূচনা হবে।

৫. জনগন জুলুম ও দুর্নীতির বিরুদ্ধে, মজলুমের পক্ষে। কিন্তু জরুরী হল যোগ্য নেতার, যিনি মজলুম হওয়া সত্ত্বেও জাতির ভবিষ্যৎ চিন্তা করে নিজের উপর জুলুমের কথা ভুলে যাবেন এবং দেশকে সামনের দিকে এগিয়ে নিয়ে যেতে প্রতিজ্ঞ হবেন যেমনটা আনোয়ার ইব্রাহীম দেখিয়েছেন।

৬. সবমিলে মাহাথির-আনোয়ারদের এই জয় মুসলিম বিশ্বের জন্য বেশ গুরুত্বপূর্ণ। কেননা মালয়েশিয়া মুসলিম বিশ্বে গুরুত্বপূর্ণ একটি দেশ। প্রেসিডেন্ট এরদোয়ানের মত মাহাথির/ আনোয়াররা যদি ভূমিকা পালন করতে পারেন, তাহলে বিশ্ব রাজনীতিতে মুসলানদের প্রভাব বাড়বে এবং বর্তমানের এই সংকটাবস্থার কিছুটা হলেও উত্তরণ ঘটবে।

Loading...