বাংলাদেশের বানিজ্যিক ব্যাংকগুলোর আসল মালিক কারা? পড়ুন বিস্তারিত…

আমানতকারীদের টাকায় ব্যাংক চলে। ব্যাংকে বিনিয়োগ করা ৯০ শতাংশ টাকাই তাদের। তবে ব্যাংকের মালিক নন তারা। অথচ ১০ শতাংশ টাকা বিনিয়োগ করেই পরিচালকরাই ব্যাংক মালিক। শুধু তাই নয়,সেইসব পরিচালকদের নির্দেশেই চলছে ব্যাংক খাত। বঞ্চিত করা হচ্ছে আমানতকারীদের। কখনও কখনও তাদের ঠকানো হচ্ছে। অনেক সময় ব্যাংকের প্রকৃত মালিকদের ওপর অন্যায়ভাবে হিডেন চার্জ আরোপ করার ঘটনাও ঘটছে।

 

Loading...

বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে ব্যাংক খাতে আমানতকারীদের প্রায় ৯ লাখ ৮৪ হাজার কোটি টাকার বেশি থাকলেও পরিচালকরা মূলধন হিসেবে রেখেছেন মাত্র ৯০ হাজার ১০১ কোটি টাকা। আশ্চর্যের বিষয় হলো, এই টাকার বিপরীতে আরও বেশি টাকা ঋণ হিসেবে তুলে নিয়েছেন পরিচালকরা। অর্থাৎ যাদের ব্যাংকের মালিক বলা হচ্ছে, পুরো ব্যাংকিং খাতে তাদের একটি টাকাও নেই। বরং তারা পরিচালক পরিচয়ে আমানতকারীদের টাকা থেকে প্রায় ৫৪ হাজার কোটি টাকা তুলে নিয়েছেন। এর বাইরে পরিচালকরা আত্মীয় বা অন্য কারও নামে আরও প্রায় দেড় লাখ কোটি টাকা ঋণ নিয়েছেন।

 

বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক ডেপুটি গভর্নর খোন্দকার ইব্রাহিম খালেদ  বলেন, ‘৯০ শতাংশ টাকা যাদের, সেই স্টেকহোল্ডাররাই (আমানতকারী) ব্যাংকের প্রকৃত মালিক। তবে তারা আছেন তৃতীয় সারিতে। দ্বিতীয় সারিতে আছেন ব্যাংকে যারা চাকরি করেন তারা।’

তিনি বলেন, ব্যাংকের ৯০ শতাংশ টাকা যাদের, তাদের স্বার্থ রক্ষার জন্য বাংলাদেশ ব্যাংককে ক্ষমতা দেওয়া হয়েছে। অন্যান্য দেশের কেন্দ্রীয় ব্যাংক আমানতকারীদের স্বার্থ দেখে। কিন্তু বাংলাদেশ ব্যাংক সাহস করে সেই ক্ষমতা প্রয়োগ করে না। এ কারণে গ্রাহকদের স্বার্থ রক্ষার পরিবর্তে শেয়ার হোল্ডার তথা পরিচালকদের স্বার্থ রক্ষা হয়।

 

বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বশেষ প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, গত বছরের সেপ্টেম্বরের শেষ দিন পর্যন্ত ব্যাংকগুলো গ্রাহকদের ঋণ দিয়েছে ৭ লাখ ৫২ হাজার ৭৩০ কোটি টাকা। এর মধ্যে ব্যাংকের পরিচালকরা ঋণ নিয়েছেন ১ লাখ ৪৩ হাজার ৭০৭ কোটি টাকা।

 

এ প্রসঙ্গে অগ্রণী ব্যাংকের চেয়ারম্যান ও বাংলাদেশ উন্নয়ন গবেষণা প্রতিষ্ঠানের (বিআইডিএস) গবেষক ড. জায়েদ বখত বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘আমানতকারীদের টাকা নিয়ে যদি নিয়মনীতি মেনে ব্যবসা করা যায়, তাহলে দেশের উন্নতি হয়, অর্থনীতির উন্নতি হয় এবং আমানতকারীদেরও উন্নতি হয়। কিন্তু ব্যাংকের অধিকাংশ টাকা যাদের, তাদের যদি ঠকানো হয়, হিডেন চার্জ আরোপ হয়, অনিয়ম ও দুর্নীতি করে ব্যাংক থেকে টাকা সরিয়ে ফেলা হয়, তাহলে সেটা হবে ক্ষতিকর।’

তিনি আরও বলেন, আমানতকারীরাদের টাকাতেই মূলত ব্যাংক চলে। তাই তাদের স্বার্থ সবার আগে দেখা উচিত।

 

বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, গত বছরের নভেম্বর পর্যন্ত দেশে মোট ৫৭টি ব্যাংকে অ্যাকাউন্ট রয়েছে ১০ কোটির বেশি। আর এসব অ্যাকাউন্টে থাকা টাকার পরিমাণ ৯ লাখ ৮৪ হাজার ৮১৪ কোটি টাকা। ব্যাংকগুলোর শেয়ার হোল্ডার বা মালিকদের জোগান দেওয়া অর্থই মূলধন হিসেবে বিবেচিত।

আন্তর্জাতিক নীতিমালার আলোকে ব্যাংকগুলোকে মূলধন সংরক্ষণ করতে হয়। গত বছরের সেপ্টেম্বর শেষে ব্যাংকগুলো মূলধন সংরক্ষণ করেছে ৯০ হাজার ১০১ কোটি টাকা। ব্যাংক খাতের মোট ঝুঁকিভিত্তিক সম্পদের যা ১০ দশমিক ৬৫ শতাংশ।

 

ব্যাংক কর্মকর্তারাও জানান, ব্যাংকের মূল পুঁজি হলো আমানত। আমানতের অর্থ ব্যবহার করাই ব্যাংকের মূল কাজ। আর এই আমানতের টাকা বিনিয়োগ করে ব্যাংক আয় করে থাকে। বাণিজ্যিক ব্যাংকের প্রাণশক্তিই হলো আমানতকারীর আমানত। আর তাই ধরে নেওয়া হয় যে আমানতকারীরাই বাণিজ্যিক ব্যাংকের অঘোষিত মালিক। তবে প্রকৃতপক্ষে এ মালিকদের অবস্থা রাজ্যহারা রাজার মতো।

 

সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, ব্যাংকগুলো আমানতকারীদের সুদ বা মুনাফা কম দিলেও তারা অস্বাভাবিক মুনাফা অর্জনে ব্যস্ত থাকে। এই মুনাফা থেকে সরকারি কর পরিশোধের পর বাকি অংশ বিনিয়োগকারীদের শেয়ারের বিপরীতে লভ্যাংশ হিসেবে বণ্টন করে দেওয়া হয়। কোনও কোনও ব্যাংককে ২৫ শতাংশ পর্যন্ত লভ্যাংশ দিতে দেখা যায়। অথচ তারা আমানতকারীদের সুদ দিচ্ছে ৫ শতাংশেরও কম।

 

এ প্রসঙ্গে জামাল উদ্দিন নামে এক গ্রাহক  বলেন, ‘ব্যাংক আমানতের ওপর কখন কত সুদ দিচ্ছে, কখন সুদ কমাচ্ছে, কখন সার্ভিস চার্জ আরোপ করছে-এসবের কিছুই আমাকে জানানো হয় না। হিসাব করে টাকা কম দিলেও কিছু করার থাকে না।’

 

তার ভাষ্য, আমানতের সুদের হার ব্যাংক কমিয়ে দিলে আমানতকারীদের পক্ষ থেকে কেউ প্রতিবাদও করে না। প্রতিবাদ করার জন্য সংগঠন দরকার, প্ল্যাটফরম দরকার, যা আমানতকারীদের মধ্যে নেই। বাংলা ট্রিবিউন

Loading...